রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:৫৬ অপরাহ্ন
ঘোষণা:
জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, ক্যাম্পাস প্রতিনিধি, বিভাগীয় প্রতিনিধি, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য জীবনবৃত্তান্ত, জাতীয় পরিচয় পত্রের কপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি ইমেইল করুন [email protected]  এই ঠিকানায়

কুষ্টিয়াতে গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন খেজুরের রস সংগ্রহতে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪১ বার পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : সোমবার, ১ নভেম্বর, ২০২১, ৬:৫১ অপরাহ্ন

কবি সুফিয়া কামাল বলেছেন- সবুজ পাতার খামের ভিতর হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে, কোন পাথারের ওপার থেকে আনল ডেকে হেমন্তকে ৷ “আসি আসি করে শীত বুঝি আর আসতে খুব দেরি নেই ৷ চলছে হেমন্তকাল ৷ হেমন্ত শেষ হওয়ার আগেই চলে এসেছে শীতের পরশ। কুয়াশার বুক চিরে ভোরের সূর্যোদয়, কিংবা সন্ধ্যার শীতল হাওয়া। এ যেন কার্তিকেই শীতের আগমনী বার্তা। ভোর আর সন্ধ্যার শীতল হাওয়া যেন বলছে শীত আর বেশি দূরে নেই।

হেমন্তের হাল্কা শীতের আবহাওয়াতে কুষ্টিয়া সহ আশ-পাশের জেলা ও গ্রাম গঞ্জে চলছে খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহের কাজ ৷ সকালের দূর্বাঘাস ও পত্রপল্লবে এসেছে শিশিরের ছোঁয়া ৷ রাতের শেষ ভাগে শিশিরের টাপুর-টুপুর মন মাতানো শব্দে পুলকিত করেছে প্রকৃতিকে ৷ এ যেন হেমন্তর আগমন বার্তা ৷ তাই শুরু হয়েছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজ ৷ খেজুর গাছের সাথে সংশ্লিষ্ট গাছিরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে ৷ জানাযায় ৯০-৯৫’র দশকে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনার দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চল জুড়ে যতদূর চোখ যেত তা ছিল সবুজের মহা সমারোহ ৷ সোনালী ফসলে ভরে থাকত সারা মাঠ ৷ ক্ষেতের আইল দিয়ে দেখা মিলত হাজার হাজার খেজুর গাছের সারি ৷ কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সবকিছুই যেন অতীত ৷ বর্তমানে বলা চলে অপরিকল্পিত নগরায়নের প্রতিযোগিতায় ইট, ভাটা ও শিল্প কল-কারখানায় বিরামহীন গতিতে গিলে খাচ্ছে কালের স্বাক্ষী খেজুর গাছ গুলোকে ৷ শীতের সকালে সোনালী রোদে বসে মিষ্টি খেজুরের রসের স্বাদ ও যেন তাই আজ ভুলতে বসেছে চিরচেনা কুষ্টিয়া সহ পাশের জেলার মানুষেরা ৷ তবুও যেখানে যে গাছগুলো এখনও নিরবে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোকে নিয়েই যেন গাছিদের শুরু হয়েছে অন্য রকম ব্যস্ততা ৷ সব মিলিয়ে শরৎ শেষে হেমন্তের প্রকৃতিই জাগান দিচ্ছে শীত এসেছে ৷

শীত আসলেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন গাছিরা । বিকেল হলেই গাছে হাঁড়ি বসাতেন আবার সকাল হলে রস সংগ্রহ করে বাড়ি নিয়ে আসতেন । দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলতো গুড় আর পাটালি তৈরির কাজ । খেজুরের গুড় আর পাটালির মৌ মৌ গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াতো । কেউ কেউ রস বিক্রি করতেন আবার কেউ স্বজনদের বাড়িতেও পাঠাতেন । কালের বিবর্তনে এসব এখন ইতিহাসের পাতায় জড়ো হচ্ছে । হারিয়ে যেতে বসেছে গাছ । প্রতিবছর শীতে তৈরি হচ্ছে খেজুরের গুড় । রস ও গুড় কিনতে বাগানে ভিড় করেন বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ । শীতের প্রতিটি সকালেই এই বাগান গুলোতে লেগে থাকে রসমেলা উৎসব । প্রকৃতিতে বইছে শীতের আগমনী বার্তা । সকালের শিশির ভেজা ঘাস আর হালকা কুয়াশায় প্রস্তুত হচ্ছে প্রকৃতি।

এবছরও সেই আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে গ্রামগুলোতে । রস সংগ্রহের জন্য এখন গাছকে বিশেষ পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে । সপ্তাখানেকের মধ্যেই পুরো দমে রস সংগ্রহ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন গাছিরা ৷ প্রায় ৪-৫ বছর ধরে গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে খেজুরের রস থেকে গুড় উৎপাদন শুরু হয়েছে । গ্রামটিতে গড়ে ওঠা বাগানগুলোতে এখন সেই এলাকার অর্থনৈতিক উন্নায়নের কাণ্ডারি বলে জানান এলাকাবাসী।

গাছ একবার ছাঁটলে তিন-চার দিন রস সংগ্রহ করা যায় এবং পরবর্তীতে তিন দিন শুকাতে হয় । এভাবে কাটলে গাছের রস সুমিষ্ট হয় । রস সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায় । রস সংগ্রহের পর হাড়ি পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে হয় অথবা আগুনে ছেকে নিতে হয় । এতে সংগৃহীত রসে গাঁজন বন্ধ হয় । ঝুঁকি নিয়েই কোমরে রশি (দড়ি) বেঁধে গাছে ঝুলে রস সংগ্রহের কাজ করেন গাছিরা ।

প্রতিদিন বিকেলে ছোট-বড় মাটির হাঁড়ি গাছে বাঁধা হয়, আর সকালে রস সংগ্রহ করা হয় । কেউ কেউ কাঁচা রস এলাকার বিভিন্ন স্থানে ও হাটে-বাজারে খাওয়ার জন্য বিক্রি করেন । আবার কেউ কেউ সকালেই এই রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করেন ।

এ বিষয়ে সাংবাদিক আজাদ হোসেনকে নাটর জেলার লালপুরের গাছি সাইদুল বলেন, বর্তমানে যে হারে খেজুর গাছ হারিয়ে যেতে বসেছে, তাতে এক সময় হয়তো আমাদের দেশে খেজুর গাছ থাকবে না । তাই গাছের সাথে সাথে গাছিরাও যেন তাদের পেশা পরিবর্তন করে চলে গেছে অন্য পেশায় ৷ কোন কোন এলাকায় যারা এখনও বাপ—দাদার পেশা আঁকড়ে পড়ে আছে গাছির পেশায় তাদেরও যেন যায় যায় অবস্থা ৷ কেমন যাচ্ছে তাদের দিন-কাল এমন প্রশ্ন করতেই যেন বড় একটা দীর্ঘশ্বাস, তারপর ছল-ছল চোখে বলেন গ্রামে এখন খেজুর গাছ নেই তাই তাদের আর ভালো থাকা ৷ কুষ্টিয়ার ঢাকাগ্রাম (বাইপাস সড়ক), মিনাপাড়া, ফুলবাড়ি,বটতৈল (ক্যানাল পাড়া) পোড়াদহ, মিরপুর, ঝিনাইদহ, যশোর, আলমডাঙ্গা, খুলনা সহ সেদিকের মাঠে এখনও কিছু কিছু গাছ রয়েছে ৷ শীতের আগমনি বার্তাতে খেজুর গাছ নাকি গাছিদের আহব্বান করে রস সংগ্রহ করার জন্য ৷

সবাই আম, কাঁঠাল আর লিচু নিয়েই ব্যস্ত। সব গাছেরই প্রয়োজন আছে । তাই নতুন করে খেজুরের বাগান বা খেজুরের গাছ রোপণে সবাইকে এক যোগে কাজ করতে হবে ৷ এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাইলে আমাদের সবার উচিত তালগাছের মতো বেশি বেশি খেজুর গাছ লাগানো এবং তা যত্ন সহকারে বড় করা ।


এ জাতীয় আরো খবর ....
এক ক্লিকে বিভাগের খবর